ঘোষণা:
আমাদের ওয়েবসাইটে স্বাগতম...

নৌকায় জয়ীরা আমার ডান হাত, স্বতন্ত্ররা বাম হাত

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১৩ বার পঠিত
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২৯ জানুয়ারী, ২০২৪, ১১:১৩ পূর্বাহ্ন

দ্বাদশ সংসদের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হিসেবে যোগ দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও তাতে সায় দেননি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ নেতা বলেছেন, ‘নৌকা প্রতীক নিয়ে যারা বিজয়ী হয়েছে তারা আমার ডান হাত এবং স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হিসেবে যারা নির্বাচিত হয়েছে তারা বাম হাত। আমি সংসদ নেতা, সবাই আমার চোখে সমান।’ গণভবনে গতকাল রাতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে শেখ হাসিনা এ কথা বলেন বলে সেখানে উপস্থিত বেশ কয়েকজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। 

স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের রীতিনীতি ও কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে ভালোভাবে ওয়াকিবহাল হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রারম্ভিক বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘দুর্নীতিকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেয়া হবে না।’ বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী। 

নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন বসছে আগামীকাল। তার আগে রোববার স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের নিয়ে এ বৈঠকে বসেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা, যিনি টানা চতুর্থবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। এ বৈঠকে যাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়, সেই ৬২ সংসদ সদস্যের মধ্যে ৫৯ জনই আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচিত।

বৈঠক শেষে জানতে চাইলে ফরিদপুর-৩ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য এ কে আজাদ বলেন, ‘সবাই তো মনোনয়ন চেয়েছিলাম, দল থেকে নৌকা পাইনি। আমরা দলের বিভিন্ন পদে আছি, বিভিন্ন দায়িত্বে আছি। আমরা আওয়ামী লীগেরই লোক। আবার একদিকে স্বতন্ত্র। এলাকায় আমাদের কাজকর্ম করতে সমস্যা হচ্ছে। এজন্য আমরা চেয়েছিলাম যেহেতু দলের মধ্যে আছি তাই আমাদের একত্রিত করা হোক।’

স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের এ নেতা বলেন, ‘তিনি (প্রধানমন্ত্রী) বলেছেন, স্বতন্ত্র হিসেবেই তোমরা কাজ করো। আমার এখানে কোনো সমস্যা হবে না। কারণ নৌকা প্রতীক নিয়ে যারা জয়ী হয়েছে এরাও আমার। আর যারা আওয়ামী লীগের পদে আছে: বিভিন্ন পদে দায়িত্বে আছে, নৌকা চেয়েছিল কিন্তু নৌকা পায় নাই (স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত) তারাও আমার। তিনি আসলে কাউকে আলাদাভাবে দেখছেন না।’

বৈঠকে আলোচ্য বিষয় নিয়ে চট্টগ্রাম-১৬ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌নেত্রী আমাদের বলেছেন তোমরা তো আওয়ামী লীগেই আছো। তোমরা আমার রিজার্ভ ফোর্স। আমরা নেত্রীকে বলেছি, আপনি সম্মতি দিয়েছেন বিধায় আমরা প্রার্থী হয়েছিলাম। ভবিষ্যতেও যে নির্দেশনা দেবেন সেটা শতভাগ পালনের চেষ্টা করব।’ 

স্বতন্ত্রদের আলাদা জোট করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা জোটের পক্ষে না, আমরা আওয়ামী লীগের পক্ষে। জোট করার প্রশ্নই ওঠে না। আমি জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি, আমি কেন জোটে যাব? নেত্রী বলেছেন যেখানে আছো, সেখানেই থাকো, সমস্যা নেই। নেত্রী আমাদের বলেছেন তোমরা অবশ্যই জনগণের পক্ষে কথা বলবা। এটা তোমাদের স্বাধীনতা। আমাদের ন্যায়ের পক্ষে থাকতে বলেছেন। অন্যায় করলে উনি কাউকে ছাড় দেবেন না।’

বিএনপি ও সমমনাদের বর্জনের মধ্যে ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহ সৃষ্টি করতে দলীয় প্রার্থীদের বিরুদ্ধে দলের কাউকে ভোটে দাঁড়াতে মানা করেনি আওয়ামী লীগ। সে কারণে প্রায় আসনেই নৌকার বিপক্ষে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামেন বিভিন্ন পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতারা। ৪৬টি আসন স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কাছে হারতে হয় আওয়ামী লীগকে। 

এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয় পেয়েছে ২২৩টি আসনে। তাদের শরিক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল পেয়েছে একটি করে আসন। আওয়ামী লীগের সমর্থনে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি জিতেছে একটি।

স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জাতীয় পার্টিও। গত দুটি সংসদের প্রধান বিরোধী দলটিকে ছাড় দিয়ে ২৬টি আসনে নৌকার প্রার্থী প্রত্যাহার করে নিয়েছিল ক্ষমতাসীনরা। কিন্তু ১৪টিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে লাঙ্গলের প্রার্থীকে হারিয়ে দেন আওয়ামী লীগের নেতারা। 

চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য আবদুচ ছালাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌বৈঠকে কথা অনেক হয়েছে। শেষ কথা হলো নেত্রী বলেছেন তোমরা সবাই আমার। এ শব্দটি তিনি তিনবার বলেছেন। আমরা বলেছি যে আমরা ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যেতে চাই। উনি তখন বলেছেন, সবাই তো আমার।’

স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংবিধান আত্মস্থ করার তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সেই সঙ্গে সংসদ কার্যপ্রণালি বিধি পড়া জরুরি বলে উল্লেখ করেছেন। সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের সংসদ ওয়েস্টমিনস্টার টাইপ পার্লামেন্ট। সংসদ প্র্যাকটিস ভালো করে জানতে হবে।’

এ বিষয়ে মাদারীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য তাহমিনা বেগম বলেন, ‌‘আমাদেরকে সংসদের নিয়মকানুন সম্পর্কে ভালোভাবে জানা-শোনার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। লাইব্রেরি ওয়ার্কের কথা বলেছেন। সংসদ সদস্য হিসেবে যে নিয়মকানুন, কালচার আছে সেগুলো অর্জনের কথা বলেছেন। সংবিধান, কার্যবিধি জানার কথা বলেছেন। আর যারা যারা বক্তব্য রেখেছেন কেউই স্বতন্ত্র জোট করবে না বলে জানিয়েছেন। আমরা সবাই সে কথার সমর্থন দিয়েছি।’ 

সংসদে যে যার মতো করে অবস্থান নিতে পারবেন বলে জানিয়েছেন ‌প্রধানমন্ত্রী—এ কথা উল্লেখ করে তাহমিনা বেগম বলেন, ‘আপনারা সবাই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন, নির্বাচিত হয়ে আসছেন। আপনাদের পদ-পজিশন নষ্ট হবে না। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সব মানুষই আমার। আমার কোনো পক্ষপাতিত্ব নেই। আমি সংসদ নেতা, সব সংসদ সদস্যই আমার কাছে সমান। বলেছেন আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর তিনি সবাইকে দেবেন। সেখানে আওয়ামী লীগ, বিএনপি নেই।’

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, স্বতন্ত্র এমপিদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যেসব প্রকল্প দেশের মানুষের জন্য অর্থবহ, সেসব প্রকল্পই গ্রহণ করা হয়। নির্বাচনী এলাকায় কেউ ভূমিহীন-গৃহহীন থাকলে তাদের জন্য ঘর তৈরি করে দেয়া হবে।’ অগ্নিসন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত থাকবে বলেও এ সময় সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেন শেখ হাসিনা। 

ঢাকা-১৮ আসন থেকে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগ নেতা মো. খসরু চৌধুরী বলেন, ‘ওনার (প্রধানমন্ত্রী) মেসেজ ছিল, আপনারা যেভাবে আছেন সেভাবেই থাকবেন। আপনারা বেশি সময় পাবেন সংসদে, আমার দলীয় যারা আছে, তাদের চেয়েও বেশি প্রায়োরিটি পাবেন।’

বৈঠকে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা তাদের অনুকূলে প্রাপ্য সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্য মনোনয়নে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে দায়িত্বভার অর্পণ করেছেন। এ প্রসঙ্গে গণভবন থেকে বেরিয়ে পিরোজপুর-২ আসনের স্বতন্ত্র এমপি মহিউদ্দিন মহারাজ বলেন, ‘আমরা সবাই আওয়ামী লীগে থাকতে চেয়েছি। আমাদের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের অনুকূলে প্রাপ্য সংরক্ষিত নারী আসনগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর হাতে ছেড়ে দিয়েছি। সংরক্ষিত আসনের বিষয়ে আমরা আগামীকালই (আজ) স্বাক্ষর করে আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদকের কাছে কাগজ জমা দেব। দলের হয়ে পরে তা নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়া হবে।’

নাটোর-১ আসনের আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘আমরা বঙ্গবন্ধুর সৈনিক। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতি করি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতি করে যাব। সংরক্ষিত আসন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অনেকেই এর সিদ্ধান্ত নেত্রীর ওপর ছেড়ে দেয়ার কথা বলেছেন। আমরা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করিনি। আগামীকাল (আজ) এটা চূড়ান্ত হবে। দেখা যাক কী হয়।’ 

একই কথা বলেছেন হবিগঞ্জ-১ আসনের স্বতন্ত্র এমপি আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরীও। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমরা স্বতন্ত্র এমপিরা সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর ওপর ছেড়ে দিয়েছি।’

স্বতন্ত্ররা স্বতন্ত্রই থাকবেন

এদিকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা ‘স্বতন্ত্রই থাকবেন’ বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার বৈঠক শেষে তিনি বলেন, ‘তারা সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করতে পারবে। এই একটা বিষয় আমাদের সংসদ নেতা, দলের সভাপতি পরিষ্কারভাবে বলেছেন।’

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘দ্বাদশ নির্বাচন উপলক্ষে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিভিন্ন মার্কার কিছু সংঘাত, সহিংসতা, অন্তর্কলহ, এসব বিষয় রয়েছে। কোথাও কোথাও বিচ্ছিন্নভাবে অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটছে। এটা আর হতে দেয়া যাবে না—আমাদের সবাইকে বলেছেন।’

তিনি বলেন, ‘তারা (স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য) দাবি করেছে আওয়ামী লীগেই থাকতে চায়। ভিন্ন কোনো নামে পরিচয় দিতে গেলে আমাদের বিবেক-আবেগ আহত হয়। নিজেদের অন্তর্কলহ বিভেদ মিটিয়ে ফেলতে হবে। নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে সবার ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।’

 Save as PDF


এ জাতীয় আরো খবর...
এক ক্লিকে বিভাগের খবর